একসময় সবাই বয়সের কাছে হার মানে। শেষ হয়ে যায় সব কিছু। তবে চাইলে মনটা সারাজীবনই তরুণ রাখা। আর মনকে তরুণ রাখার পাশাপাশি ধরে রাখা যায় বয়সকে কিছুটা সময় পর্যন্ত। আপনি নন, বয়সই হার মানবে আপনার কাছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে যে স্বাভাবিক কোমলতা বা উজ্জ্বলতা থাকে, তা হারিয়ে যায়। কিছু কিছু নিয়ম মেনে চললে এই বুড়িয়ে যাওয়া ভাবকে ঠেকানো যায়। যেমন সঠিক খাদ্য তালিকা মেনে চলা, নিয়মিত ত্বকের আর শরীরের ঠিকমতো যত্ন নেয়া। বয়স হলে শরীর ও মনে আসে কিছু পরিবর্তন। যেমন ত্বকে দাগ বা ভাঁজ পড়া, ত্বকের রং পরিবর্তন, ত্বক ছাপিয়ে শিরা দৃশ্যমান হওয়া, শারীরিক অবকাঠামো ভেঙ্গে পড়া ইত্যাদি। এ সবকিছু মিলে যে ব্যাপারটি সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, তা হলো মানসিক অবসাদ। ত্বকের ওপর বয়সের প্রভাব মূলত জীবনের চার অধ্যায়ে ভাগ করা যায় কৈশোর, তারুণ্য, মধ্য বয়স ও বার্ধক্য। কৈশোরে ত্বকের যে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়, তার পরিণতি মেলে তারুণ্যে। ত্বকে বয়সের ছাপ পড়ার শুরুটা মধ্য বয়সে। এ বয়সে ত্বকে কোলাজেনের পরিমাণ প্রতিবছর শতকরা এক ভাগ কমতে থাকে। এতে চোখের চারপাশে ও কপালে দেখা দেয় বলিরেখা। শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে খুব তাড়াতাড়ি। ত্বকনিঃসৃত তেলের নিঃসরণ কমে যায় বলে সহজেই ত্বকে দাগ পড়ে। বার্ধক্যে ত্বকের নিচে জমে থাকা চর্বি কমে যেতে থাকে বলে চামড়া বা ত্বক ঝুলে পড়ে।

বয়সকে জয় করার মূলমন্ত্র কিন্তু ইতিবাচক চিন্তা আর তারুণ্য। তারুণ্য চিরকালীন। আপনার মন সজীব থাকলে কারও সাধ্য নেই আপনাকে বুড়িয়ে দেয়ার। নিজের প্রতি মনোযোগ ও যত্ন আর সব সময় হাসিখুশি থাকার মূলমন্ত্র আয়ত্তে আনতে হবে নিজেকেই। বয়সের পরিপক্বতাকে আত্মবিশ্বাসের অনুষঙ্গ মনে করে বাকি সব উপসর্গ সহজেই মুছে দেয়া সম্ভব। আক্ষরিক অর্থে হিসাব করতে বসলে মনে পড়ে, বেশকিছু বছর চলে গেছে জীবন থেকে। অথচ আমাদের মনেই থাকে না। আসল কথা হলো, মন যদি সুন্দর থাকে, তবে কিছুই কিন্তু বাধা হতে পারে না। নিজেকে ঠিক রাখতে হলে সবার আগে মনটাকে হাসিখুশি রাখা চাই। জীবনে আনন্দের সঙ্গে বেদনারও বসবাস। তাই বলে সেটা ধরে বসে থাকলে চলবে না। বাইরে সুন্দর থাকাটাও কিন্তু খুবই দরকার। আমাদের দেশের আবহাওয়া যেমন, তাতে ঘরে থাকলেও নিজের যত্ন নিতে হবে। সাধারণত আমরা নিজের প্রতি খুব একটা যত্ন নিই না। ব্যাপারটা আমরা সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারি, যখন আমাদের ত্বক স্বাভাবিক কোমলতা হারায়। ছোটবেলা থেকে পরিচ্ছন্ন থাকার চর্চা করতে হয়। মন যদি তরুণ থাকে, তবে এর অভিব্যক্তি মুখেও পড়ে। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। পানি ত্বকে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ঠিক রেখে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখে। আর একটা কথা, ‘মন ভাল থাকাটা খুবই জরুরী।’

সবার আগে নিজের খাদ্যাভ্যাস নজরে আনা উচিত। কোন খাবার ত্বকের জন্য ভাল আর কোনটি নয়- সে বিষয়ে রাহিমা সুলতানা বলেন, ‘রঙিন খাবার, যেমন- প্রচুর শাক-সবজি, ফলমূল খাওয়া উচিত। তাজা খাবার ত্বক সতেজ করে। মাংস বাদ দিয়ে মাছ খাওয়ার অভ্যাস বাড়িয়ে তুলুন। ইচ্ছোমতো ভাত বা ভাত জাতীয় খাবার না খেয়ে সবজির স্যুপ বা এ জাতীয় খাবার খান। শাকাহারী শব্দটিকে ভালবাসতে শিখুন। বাদাম, পেস্তা অথবা মাছের তেল বাদে অন্যান্য তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। মিষ্টি জাতীয় খাবার, চিনি ইত্যাদি যথা সম্ভব খাদ্য তালিকার বাইরে রাখুন। সপ্তাহে এক বা দুই দিন মাংস খেলেও প্রচুর সবজি রাখুন সঙ্গে। বার্ধক্যে কাজের পরিমাণ সাধারণত কমে যায় বলে ক্যালরির চাহিদাও কমে যায়। তাই উচ্চ ক্যালরিসম্পন্ন খাবার এড়িয়ে চলুন। ত্বকের দাগ ও ভাঁজ নির্মূলে সাহায্য করে। পুষ্টিকর খাবার, আঁশযুক্ত খাবার খাদ্য তালিকায় সংযোজন করুন।

নিয়মিত শরীরচর্চা, হঁাঁটা শরীরকে রাখে উপযুক্ত, মনেও আনে প্রশান্তি। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও শরীরচর্চার কোন বিকল্প নেই। সুনিদ্রা সুস্বাস্থ্যের বড় বন্ধু। নিয়মিত শরীরচর্চা সুনিদ্রার সহায়ক। শারীরিক ও মানসিক অবসাদ দূরীকরণে এর কোন বিকল্প নেই।

ত্বক নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে। হাত ও পায়ের যতেœ মনোযোগ বাড়িয়ে দিতে হবে। রূপ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। উপযুক্ত মালিশ করানো উচিত নির্দিষ্ট সময় অন্তর। তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী।

যে কোন ব্যাপারে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভাল। তবুও প্রতিরোধের সময় পার হয়ে গেলেও প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। ডায়েটিশিয়ানের মতে, ‘আমাদের ত্বকের স্তর তিনটি। উপরের স্তর এপিডার্মিস, যা চামড়া নামে পরিচিত। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এ স্তরের আর্দ্রতা কমতে থাকে। ত্বক মলিন হয়। বলিরেখা দেখা দেয় এ স্তরেই। এর পরের স্তর ডার্মিস, যেখানে থাকে কোলাজেন বা ইলাস্টেন। ত্বক টান টান রাখার দায়িত্ব এ স্তরের। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে টান টান ভাব কমতে থাকে। শেষ স্তরের নাম সাবকিউটেনাস টিস্যু। বয়স অনেক হয়ে গেলে ভেতরের এ স্তরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে। এ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খেতে হবে। ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ডি’-সমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি ভিটামিন ‘সি’সমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ প্রচুর বাড়িয়ে দেয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মতো ভিটামিন ‘এ’ এবং ভিটামিন ‘ই’ ক্যাপসুল খাওয়া যেতে পারে। হলুদ ফলমূল, সবুজ শাক-সবজি ইত্যাদির পরিমাণ খাদ্য তালিকায় বাড়াতে হবে। আমিষ খাওয়ার বেলায় মাংসের পরিবর্তে মাছের দিকে পক্ষপাতিত্ব বাড়ান। এই চর্চা কম বয়স থেকেই থাকা ভাল।

Share